মুহম্মদ ঘুরীর সেনাপতি কুতুবউদ্দিন আইবেকের আদেশক্রমে তুর্কী বার ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজী ১২০৪ সালে মাত্র ১৭-১৮ জন অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে বাংলার শেষ স্বাধীন সেন বংশের রাজা লক্ষণ সেনকে পরাজিত করে বাংলা দখল করেন। বখতিয়ার খলজীর বাংলা অধিকারের মাধ্যমে বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা হয়। তিনি দিনাজপুরের দেবকোটে বাংলার রাজধানী স্থাপন করেন।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
বাংলায় মুসলিম শাসনের প্রাথমিক পর্যায় ছিল (১২০৪-১৩৩৮) সাল পর্যন্ত। এ যুগের শাসকগণ সবাই দিল্লির সুলতানের অধীনে বাংলার শাসনকর্তা হয়ে এসেছিলেন। বাংলার অনেক শাসনকর্তাই দিল্লির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে স্বাধীন হতে চেয়েছিলেন। বারংবার এমন বিদ্রোহ সংঘটিত হওয়ার জন্য দিল্লির ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারানী “তারিখ- ই-ফিরোজশাহী" গ্রন্থে বাংলার নাম দিয়েছিলেন বুলগাকপুর বা বিদ্রোহের নগরী।
বাংলায় তুর্কী শাসক
- নাসির উদ্দিন মাহমুদ বাংলার প্রথম তুর্কি শাসক ছিলেন। তিনি ইলতুৎমিসের পৌত্র ছিলেন।
- সুলতান গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খলজি 'বাসনকোর্ট' দুর্গ নির্মাণ করেন। প্রথম মুসলিম নৌবাহিনী গঠন করে।
- সুলতান সামসুদ্দিন ফিরোজ শাহ সিলেটের অত্যাচারী গৌরগোবিন্দকে পরাজিত করেন। তার সময়ে হযরত শাহ জালাল বাংলায় আসেন।
নাসিরউদ্দিন মাহমুদ (শাসনকাল: ১২৪৬–১২৬৬) ছিলেন দিল্লির মামলুক সালতানাতের ৮ম সুলতান। তিনি নাসিরউদ্দিন মাহমুদের পুত্র ও সুলতান ইলতুতমিশের পৌত্র ছিলেন। ইলতুতমিশ তাকে তার বাবার নাম প্রদান করেছিলেন। আলাউদ্দিন মাসুদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি মসনদে বসেন।
মাহমুদ ধার্মিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। নামাজ এবং কুরআন লিপিবদ্ধকরণে তিনি অনেক সময় ব্যয় করতেন। তার শ্বশুর গিয়াসউদ্দিন বলবন মূলত শাসনকাজ তদারক করতেন।
১২৬৬ সালে মাহমুদ নিঃসন্তান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করার পর বলবন মসনদে বসেন।
হুসামউদ্দীন ইওজ খলজী, যিনি পরবর্তীতে গিয়াসউদ্দীন ইওজ শাহ নামে পরিচিত হন, ছিলেন ত্রয়োদশ শতকের প্রথম ভাগে বাংলার একজন গুরুত্বপূর্ণ খলজি শাসক। তিনি প্রথমে ১২০৮–১২১০ খ্রিস্টাব্দে এবং পরে ১২১২–১২২৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলা শাসন করেন। তাঁর শাসনকালকে গঠনমূলক বলা হয়, কারণ তিনি বন্যা প্রতিরোধ ব্যবস্থা, প্রাচীনতম বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলার অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন করেন। তিনি বাংলার প্রথম নৌবাহিনী গঠন করেন এবং লখনৌতি (গৌড়) ও বাসনকোট দুর্গ প্রতিষ্ঠা করেন।
গিয়াসউদ্দীন ইওজ খলজীর শাসনামলে বাংলায় দীর্ঘ সময় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় ছিল। তিনি রাজধানী দেবকোট থেকে গৌড়ে স্থানান্তর করেন এবং পূর্ববঙ্গ, কামরূপ, ত্রিহুত ও উৎকল অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা করে সেগুলোকে করদ রাজ্যে পরিণত করেন। তবে তাঁর বিহার জয় দিল্লির মামলুক সুলতান ইলতুতমিশের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়। ১২২৪ ও ১২২৬ খ্রিস্টাব্দে ইলতুতমিশের অভিযানে গিয়াসউদ্দীন ইওজ খলজী পরাজিত ও নিহত হন। এর ফলে বাংলা দিল্লির মামলুক সালতানাতের একটি প্রদেশে পরিণত হয়।
বখতিয়ার খলজীর মাধ্যমে বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর প্রায় এক শতাব্দীকাল দিল্লি সালতানাত ও বাংলার মধ্যে টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকে। দিল্লির সুলতানরা বাংলার শাসনকর্তা নিয়োগ করলেও তাঁরা প্রায়ই স্বাধীনতা ঘোষণা করতেন। গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খলজীর স্বাধীনতা ঘোষণা ও তুঘ্রিলের বিদ্রোহ এই প্রবণতারই প্রকাশ। এসব বিদ্রোহ দমন করতে দিল্লির সুলতান শামসউদ্দিন ইলতুৎমিশ ও গিয়াসউদ্দিন বলবনকে বাংলা অভিযানে আসতে হয়। বলবন বিদ্রোহ দমন করে তাঁর পুত্র বুঘরা খানকে বাংলার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। বাংলার এই বিদ্রোহপ্রবণ চরিত্রের জন্য ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারাণী লখনৌতিকে ‘বলঘাপুর’ বা বিদ্রোহের নগরী বলে অভিহিত করেন।
বলবনের মৃত্যুর পর (১২৮৬ খ্রি.) বুঘরা খান নিজেকে বাংলার স্বাধীন সুলতান ঘোষণা করেন। এই ধারাবাহিকতার ফলেই শামসউদ্দিন ফিরোজ শাহের আবির্ভাব ঘটে। ১৩০০ থেকে ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কাল বাংলার ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের প্রথম দিকে লখনৌতি শামসউদ্দিন ফিরোজ শাহের অধীনে স্বাধীন ছিল। দিল্লিতে খলজি বংশের শাসনামলে বাংলা কার্যত স্বাধীন থাকলেও তুঘলক বংশ ক্ষমতায় এলে লখনৌতি পুনরায় দিল্লির অধীনে আসে। তবে সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের রাজত্বকালে ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলা আবার স্বাধীন হয় এবং এই স্বাধীনতা প্রায় দুইশত বছর স্থায়ী হয়।
সুলতান শামসউদ্দিন ফিরোজ শাহ (১৩০১–১৩২২ খ্রি.) ছিলেন গৌড়ের একজন স্বাধীন ও শক্তিশালী শাসক। তিনি আব্বাসীয় খলিফার নামে মুদ্রা জারি করে নিজের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দেন। তাঁর শাসনামলে গৌড় মুসলিম শাসকদের রাজধানী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফিরোজ শাহ রাজ্য বিস্তারে মনোযোগ দেন এবং তাঁর শাসনামলে বাংলা পশ্চিমে সোন ও ঘোড়া নদী থেকে পূর্বে সিলেট এবং উত্তরে দিনাজপুর–রংপুর থেকে দক্ষিণে হুগলী ও সুন্দরবন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
ফিরোজ শাহের রাজত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে সিলেট বিজয়। এই বিজয়ের সঙ্গে সুফি সাধক হযরত শাহজালাল (রহ.) ও সৈয়দ নাসির উদ্দিনের নাম বিশেষভাবে যুক্ত। তাঁর শাসনামলে সোনারগাঁও ও সাতগাঁও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয় এবং বিভিন্ন টাকশাল থেকে মুদ্রা জারি করা হয়। তিনি তাঁর পুত্রদের সহায়তায় শাসনকার্য পরিচালনা করেন এবং ক্ষমতা ভাগ করে দেন, যা বাংলায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হয়।
১৩২২ খ্রিস্টাব্দে শামসউদ্দিন ফিরোজ শাহ মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর গিয়াসউদ্দিন বাহাদুর শাহ সিংহাসনে আরোহণ করেন। ফিরোজ শাহের শাসনকাল বাংলার স্বাধীন সুলতানি শাসনের ভিত সুদৃঢ় করে এবং পরবর্তী দীর্ঘ স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত করে।
দিল্লির সুলতানগণ (১৩৩৮-১৫৩৮) এ দুইশত বছর বাংলাকে তাদের অধিকারে রাখতে পারেনি। এ সময় বাংলার সুলতানরা স্বাধীনভাবে বাংলা শাসন করেন। ১৩৩৮ সালে সোনারগাও এর শাসক বাহরাম খানের মৃত্যু হলে তার বর্মরক্ষক 'ফখরা' সুযোগ বুঝে নিজে ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ নামধারণ করে সোনারগাওয়ের সিংহাসন দখল করেন।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ
নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহ
আলাউদ্দিন হোসেন শাহ
গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ
খরউদ্দিন মুবারক শাহের পূর্বনাম ফখরা। তিনি ছিলেন বাংলার প্রথম স্বাধীন সুলতান। তিনি সোনারগাঁয়ের শাসন ক্ষমতা দখল ও স্বাধীনতা ঘোষণা করেন- ১৩৩৮ সালে । স্বাধীন সুলতান হিসাবে তিনি উপাধি গ্রহণ করেন ফখরউদ্দিন মুবারক শাহ। তিনি চট্টগ্রাম থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত রাজপথ নির্মাণ করেন। ইবনে বতুতা তার আমলে (১৩৪৬) সালে বাংলায় আসেন।
শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ অবিভক্ত বাংলার প্রথন মুসলিম স্বাধীন সুলতান ছিলেন এবং ইলিয়াস শাহী বংশের করেন। ইলিয়াস শাহী বংশ ১৩৪২ সাল থেকে ১৪১৫ সাল পর্যন্ত একটানা ৭৩ বছর ধরে অবিভক্ত বাংলা শাসন করে।
জেনে নিই
- ১৩৫২ সালে ইলিয়াস শাহ পুরো বাংলা অধিকার করেন।
- প্রাচীন জনপদগুলোকে একত্রিত করে নাম দেন 'বাঙ্গালাহ'।
- তার উপাধি 'শাহ-ই-বাঙ্গালাহ' বা ‘শাহ-ই-বাঙ্গালিয়ান’।
- তিনিই প্রথম উপাধি গ্রহণের মাধ্যমে বাংলা রাষ্ট্রের পরিচয় তুলে ধরেন।
- ইলিয়াস শাহ বাংলার রাজধানী গৌড় থেকে পান্ডুয়া নগরীতে স্থানান্তর করেন।
পাণ্ডুয়ার আদিনা মসজিদ সিকান্দার শাহের অমর কীর্তি। তিনি সবচেয়ে দীর্ঘসময় ক্ষমতায় থাকা সুলতান। সুলতান সিকান্গৌদার শাহ গৌড়ের কোতয়ালী নরজা নির্মাণ করেন।
সবচেয়ে জনপ্রিয় সুলতান ছিলেন গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ। আজম শাহ বাংলা ভাষার পরম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁর সময়ে ইউসুফ জোলেখা রচনা করেন কবি শাহ মুহম্মদ সগীর । এ সময় কৃত্তিবাসের রামায়ণ বাংলা অনুবাদ করা হয়। পারস্যের কবি হাফিজের সাথে তিনি পত্রালাপ করতেন।
বাংলার স্বাধীন সুলতানদের মধ্য সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন আলাউদ্দিন হুসাইন শাহ। তাকে বলা হয় বাংলার আকবর, তার শাসনামলকে বাংলার স্বর্ণযুগ বলা হয়। হুসাইন শাহের আমলে বাংলার রাজধানী ছিল গৌড় । তিনি সংগ্রাম থেকে আরাকানীদের বিতাড়িত করেন। হুসাইন শাহের রাজত্বকালে শ্রীচৈতন্য বৈষ্ণব আন্দোলন (বৃন্দাবন) গড়ে তোলেন। হুসাইন শাহের সেনাপতি কবীন্দ্র পরমেশ্বর বাংলা ভাষায় মহাভারত রচনা করেন। বিপ্রদাস, বিজয়গুপ্ত, যশোরাজ খান প্রমুখ সাহিত্যিকগণ তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। হুসেন শাহী আমলে বাংলা গজল ও সুফী সাহিত্যের সৃষ্টি হয়। তাঁর শাসনামলে গৌড়ের ছোট সোনা মসজিদ ও গুমতিদ্বার নির্মিত হয়।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
গৌড়ের বিখ্যাত বড় সোনা মসজিদ (বারদুয়ারি মসজিদ) নির্মাণ করে। সুলতান নাসির উদ্দিন নুসরাত শাহের অমরকীর্তি- কদম রসুল। তার সময়ে ভারতে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
বাংলার শেষ স্বাধীন সুলতান ছিলেন গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ। ১৫৩৮ সালে শেরশাহ গৌড় দখলের মাধ্যমে বাংলায় স্বাধীন সুলতানী যুগের অবসান ঘটে।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
ইবনে বতুতা ছিলেন মুসলিম পর্যটক, চিন্তাবিদ এবং বিচারক। তিনি ১৩০৪ খ্রিস্টাব্দে মরক্কোয় অনুগ্রাহণ করেন। ১৩৩৩ খ্রিস্টাব্দে মুহম্মদ বিন তুঘলকের রাজত্বকালে ইবনে বক্তৃতা ভারতবর্ষে আগমন করেন। সুলতানের সাথে পরিচয় ঘটলে তিনি এই পরিব্রাজককে কাজীর পদে নিযুক্ত করেন। ইবনে বতুতা অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে ৮ বছর উক্ত পদে বহাল ছিলেন। ইবনে বতুতা ফখরউদ্দিন মুবারক শাহের রাজত্বকালে ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় আসেন। বাংলাদেশে আসার তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল সিলেটে গিয়ে হযরত শাহজালালের সঙ্গে সাক্ষাৎকরা। ইবনে বক্তৃতা প্রথম বিদেশি পর্যটক হিসাবে 'বাঙ্গালা' শব্দ ব্যবহার করেন। নিত্যনৈমিত্তিক দ্রব্যাদির প্রাচুর্য ও স্বল্পমূল্য আর মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী ইবনে বতুতাকে আকৃষ্ট করলেও এদেশের আবহাওয়া তাঁর পছন্দ হয়নি। ইবনে বক্তৃতার তার 'কিতাবুল রেহেলা' নামক গ্রন্থে বাংলাকে “দোযখপুর আয নিয়ামত বা 'আশীর্বাদপুষ্ট নরক' হিসাবে আখ্যায়িত করেন।
সম্রাট আকবর পুরো বাংলার উপর অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। বাংলার শক্তিশালী জমিদারগণ মুঘলদের বশ্যতা স্বীকার করেনি। স্বাধীনতা রক্ষার্থে তারা একজোট হয়ে মুঘল সেনাপতির বিরুদ্ধে লড়াই করতেন। বাংলার ইতিহাসে ভাটি অঞ্চলের এ জমিদারগণ বারো ভূঁইয়া নামে পরিচিত।
কয়েকজন শাসক
- ঈসা খান সোনারগাঁও অঞ্চল শাসন করেন।
- কেদার রায় বিক্রমপুর শাসন করেন।
- কিঙ্কর সেন পিরোজপুর শাসন করেন।
- ওসমান খা উড়িষ্যা শাসন করেন।
- প্রতিপাদিত্য যশোর অঞ্চল শাসন করেন।
- ফজল গাজী গাজীপুর শাসন করে।
- কন্দর্প রায় বরিশাল শাসন করে।
- পীতাম্বর পুঠিয়া শাসন করে।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
বারো ভূঁইয়াদের নেতা ছিলেন ঈসা খান। তিনি বাংলার ধানী হিসেবে সোনারগাও এর গোড়া পত্তন করেন। সম্রাট আকবরের সেনাপতিরা বারো ভূঁইয়াদের নেতা ঈসা খাঁকে পরাজিত করতে ব্যর্থ হন। ঈসা খাঁর মৃত্যুর পর বারো ভূঁইয়াদের নেতা হন ঈসার পুত্র মুসা খান। তার আমলেই বাংলার বারো ভূঁইয়াদের চূড়ান্তভাবে দমন করা হয়। সুবেদার ইসলাম খান বারো ভূঁইয়ানের নেতা মুসা খানদের পরাস্ত করেন। এগারসিন্ধুর গ্রাম (কিশোরগঞ্জ) ইসা খানের নাম বিজড়িত মধ্যযুগীয় একটি দূর্গ।
১৫৭৬ সালে রাজমহলের যুদ্ধে বাংলার শেষ আফগান শাসক দাউদ কররানী পরাজিত হলে বাংলায় মুঘল শাসন শুরু হয়। এ সময় মুঘল শাসক ছিলেন সম্রাট আকবর। সুবাদারি ও নবাবি এ দুই পর্বে বাংলায় মুঘল শাসন অতিবাহিত হয়। বারোভূঁইয়াদের দমনের পর সমগ্র বাংলায় সুবেদারী প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সময় সমগ্র বঙ্গ দেশ সুবহ-ই-বাঙ্গালাহ নামে পরিচিত হয়। মুঘল প্রদেশগুলো সুবা নামে পরিচিত ছিল। প্রাদেশিক শাসনকর্তাকে বলা হতো সুবাদার।
মানসিংহ সম্রাট বরের সেনাপতি ছিলেন। তিনি বাংলা দখল নেওয়ার প্রচেষ্ঠা চালান এবং বারো ভূঁইয়াদের দমন করতে ব্যর্থ হন।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
১৬০৮ সালে ইসলাম খানকে সুবেদার হিসেবে নিয়োগ দেয় সম্রাট জাহাঙ্গীর। তিনি বারো ভূঁইয়াদের দমন করে সমগ্র বাংলায় সুবাদারি শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ১৬১০ সালে বিহারের রাজমহল থেকে রাজধানী ঢাকায় নিয়ে আসেন। সুবেদার ইসলাম খান ঢাকার নামকরণ করেন জাহাঙ্গীরনগর। ইসলাম খান ঢাকার 'ধোলাই খাল খনন করেন। তিনি বাংলার নৌকা বাইচ উৎসবের সূচনা করেন।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
ইব্রাহিম খান
ইসলাম খান
শায়েস্তা খান
মীর জুমলা
শায়েস্তা খান বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হন ১৬৬৪ খ্রিস্টাব্দে। আওরঙ্গজেবের মামা ছিলেন শায়েস্তা খান। চট্টগ্রাম অধিকার করে আরাকানি মগ জলদস্যুদের উৎখাত করেন। আরাকানি জলদস্যুদের হটিয়ে তিনি চট্টগ্রামের নাম রাখেন ইসলামাবাদ। শায়েস্তা খান বাংলা থেকে ইংরেজদের বিতাড়িত করেন। টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত শায়েস্তা খানের আমলে। তাঁর আমলের স্থাপত্যশিল্প ছোট কাটরা, লালবাগ কেল্লা, চক মসজিদ, সাত গম্বুজ মসজিদ, পরি বিবির মাজার (শায়েস্তা খানের মেয়ে), হোসেনী দালান, বুড়িগঙ্গার মসজিদ, প্রভৃতি।
কাশিম খান জুয়ানি সম্রাট শাহজাহান কর্তৃক নিয়োগকৃত প্রথম সুবেদার। পর্তুগিজদের অত্যাচারের মাত্রা চরমে পৌঁছলে সম্রাট শাহজাহানের আদেশে কাসিম খান তাদেরকে শক্ত হাতে দমন করেন।
সম্রাট শাহজাহানের ২য় পুত্র শাহ সুজা ২০ বছর বাংলায় সুবাদারি করেন। তিনি ইংরেজদের বিনা শুল্কে বানিজ্য করার সুযোগ নেন। শাহজাদা সুজা ঢাকার চক বাজারে 'বড় কাটরা মসজিদ নির্মাণ করেন। সুজা তার ভ্রাতা আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন।
আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলা সুজাকে দমনের জন্য বাংলার রাজধানী জাহাঙ্গীরনগর পর্যন্ত এসেছিলেন। সম্রাট আওরঙ্গজেব তাঁকে বাংলার সুবাদারের দায়িত্ব নেন। তিনি ঢাকা গেট (পূর্ব নাম মীর জুমলা) নির্মাণ করেন। কৃষকদের নিকট থেকে প্রথম কর আদায় করেন।
পরিবিবি ছিলেন শায়েস্তা খানের কন্যা। পরিবিবির আসল নাম ইরান দুখত রহমত বানু। লালবাগ দুর্গের মাঝখানে বর্গাকার ভবনটিতে তার কবর।
যুগে যুগে বাংলার ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এ অঞ্চলের নামেও পরিবর্তন এসেছে।
- বঙ্গ
- বাঙ্গালাহ
- জান্নাতাবাদ
- সুবে বাংলা
- বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি
- পূর্ববঙ্গ
- পূর্ব পাকিস্তান
- বাংলাদেশ
১৩৫২ সালে সুলতান ইলিয়াস শাহ ১৬ টি জনপদ একত্রিত করে বঙ্গের নাম দেন বাঙ্গালাহ ।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
১৫৩৮ সালে মুঘল সম্রাট হুমায়ুন গৌড়ের সৌন্দর্য দেখে বাঙ্গালার নাম দেন 'জান্নাতাবাদ'।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
১৫৭৬ সালে মুঘল সম্রাট আকবর জান্নাতাবাদ নামকরণ করে ‘সুবে বাংলা’। সুবে অর্থ প্রদেশ।
লর্ড কার্জনের আমলে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হলে বঙ্গের নাম হয় ‘পূর্ব বঙ্গ’ ।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সরকার সাংবিধানিক ভাবে পূর্ব বঙ্গের নাম 'পূর্ব পাকিস্তান' হয়।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব বাংলার নামকরণ করেন বাংলাদেশ।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
২৬ মার্চ, ১৯৭১
১১ এপ্রিল, ১৯৭১
১৭ এপ্রিল, ১৯৭১
১০ জানুয়ারি, ১৯৭২
বাংলার ইতিহাসের পট পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নবাবি আমলের গুরুত্ব সর্বাধিক। মুর্শিকুলি খানের শাসন কাঠামোয় আবির্ভাব থেকে শুরু করে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যে বদল এসেছিল তারই ধারাবাহিক পরিণতি হিসেবে ব্রিটিশরা ক্ষমতা দখল করেছিল বাংলার। অনেক দরিদ্র পরিবারের সন্তান মুর্শিদকুলি খান প্রথমে সাধারণ একজন দিউয়ান হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। নানা স্থানে দিউয়ানীর কাজে তাঁর অভিজ্ঞতা সম্রাট আওরঙ্গজেবকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছিল। আওরঙ্গজেব তাঁকে হায়দারাবাদের দিওয়ান নিযুক্ত করার পর তাঁকে "করতলব খান" উপাধিও প্রদান করা হয়। অভিজ্ঞতা ও কর্ম নৈপুণ্যে সন্তুষ্ট হয়ে আওরঙ্গজেব মুর্শিদকুলি খানকে বাংলার অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও রাজস্ব সংস্কারের দায়িত্ব প্রদান করেছিলেন। বলতে গেলে তার মাধ্যমেই বাংলায় নবাবি শাসনের উত্থান হয়েছিল। তারপর পরবর্তীকালের শাসকদের অদূরদর্শীতা, অদক্ষতা ও বিশৃঙ্খল আচরণ শেষ পর্যন্ত নবাবি শাসনের পতন ডেকে আনে।
বাংলার নবাবী আমল বলতে মূলত ১৭০৭-১৭৫৭ খ্রিঃ পর্যন্ত সময়কে বোঝায়, যা মুঘল সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগে বাংলার সুবাহদারদের (প্রাদেশিক শাসক) ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রায় স্বাধীনভাবে শাসন করাকে নির্দেশ করে; মুর্শিদকুলী খান এর সূচনা করেন, এবং এই আমলের শেষ স্বাধীন নবাব ছিলেন সিরাজউদ্দৌলা, যিনি পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত হলে নবাবী শাসনের কার্যত অবসান ঘটে এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা পায়।
- মুর্শিদ কুলি খান (১৭১৭-১৭২৭)
- আলীবর্দি খান (১৭৪০-১৭৫৬)
- অন্ধকূপ হত্যা-১৭৫৬
- সিরাজউদ্দৌলা (১৭৫৬-১৭৫৭)
- পলাশীর যুদ্ধ-১৭৫৭
- বক্সারের যুদ্ধ-১৬৬৪
- ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
মুর্শিদ কুলি খান বাংলায় প্রথম স্বাধীন নবাবী রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন ১৭১৭ সালে। তাঁর সময় সুবাকে বলা হতো ‘নিজামত’ আর সুবাদারের বদলে পদবি হয় ‘নাজিম’। সম্রাট ফররুখ শিয়ার শাসনকালে মুর্শিদকুলি খান বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হন। তিনি বার্ষিক ১ কোটি ৩ লক্ষ টাকা রাজস্ব পাঠাতেন। তাঁর শাসনামলে বাংলা সুবা বাংলা প্রায় স্বাধীন হয়ে পড়ে।
আলীবর্দি খান বাংলার প্রথম প্রকৃত স্বাধীন নবাব । তিনি মুঘল সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান বন্ধ করেন। মুসলমান শাসনামলে এদেশে এসে অত্যাচার ও লুট করেছে বর্গীরা। বাংলা থেকে মারাঠা বর্গীদের বিতাড়িত করেন আলীবর্দি খান।
নবাব সিরাজউদ্দৌলার কলকাতা অভিযানের সময় হলওয়েলসহ কতিপয় ইংরেজ কর্মচারী ফোর্ট উইলিয়ামে বন্দী হয়ে ছিলেন। হলওয়েলের বর্ণনা অনুসারে জানা যায়, নবাব ১৪৬ জন ইউরোপীয় ইংরেজ বন্দীকে একটি ক্ষুদ্র অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আবদ্ধ রাখেন। প্রচন্ডে গরমে ক্ষুদ্র জায়গায় ১৪৬ জনের মধ্যে ১২৩ জন শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যায়। হলওয়েল কর্তৃক প্রচারিত এই কাহিনি অন্ধকূপ হত্যা নামে প্রচারিত হয়। অন্ধকূপ হত্যার ঐতিহাসিক সত্যতা পাওয়া যায়নি।
সিরাজউদ্দৌলার প্রকৃত নাম মির্জা মোহাম্মদ বেগ। তিনি ছিলেন শেষ স্বাধীন নবাব। আলীবর্দি খান নবাব উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন তাঁর কনিষ্ঠ কন্যা আমেনা বেগমের পুত্র সিরাজউদ্দৌলাকে। ১৭৫৬ সালে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার সিংহাসনে বসেন মাত্র ২৩ বছর বয়সে। ১৭৫৬ সালে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ দখল করে নেন এবং কলকাতার নাম রাখেন আলীনগর।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
পলাশীর যুদ্ধ সংঘটিত হয় ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন। এ যুদ্ধে ইংরেজদের পক্ষে নেতৃত্ব দেন রবার্ট ক্লাইভ। আলীবর্দির প্রথম কন্যা ঘষেটি বেগমের ইচ্ছে ছিল তাঁর দ্বিতীয় ভগ্নির পুত্র শওকত জঙ্গ নবাব হবেন। ফলে তিনি সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেন। তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে সাহায্য করেন সেনাপতি মীর জাফর, খালা ঘসেটি বেগম, রায়দুর্লভ, জগৎশেঠ, উমিচান, রাজবল্লভ প্রমুখ। নবাবের পক্ষে যুদ্ধ করেন মীরমদন, মোহনলাল ও ফরাসী সেনাপতি সিনফ্রে ।
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশির যুদ্ধে নবাবের সেনাপতি মীর জাফর বিশ্বাসঘাতকতা করে যুদ্ধে অংশগ্রহণে বিরত থাকেন। বিশ্বাসঘাতকতায় অসহায়ভাবে পরাজয় বরণ করেন সিরাজউদ্দৌলা। পলাশির যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজরা বাংলায় রাজনৈতিক শাসনের ভিত্তি স্থাপন করে। মুঘল সাম্রাজ্যের স্থিতিকাল প্রায় ৩৩১ বছর (১৫২৬-১৫৫৭)। তবে ১৭৫৮ সাল পর্যন্ত প্রতীকি দায়িত্ব টিকে ছিল মুঘলদের। সর্বশেষ সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
মীর কাসিম ছিলেন মীর জাফরের জামাতা। তিনি ১৭৬০ সালে বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন। মীর কাসিম ছিলেন একজন সুযোগ্য শাসক ও একনিষ্ঠ দেশপ্রেমিক। তাই প্রশাসনকে ইংরেজ প্রভাবমুক্ত করার জন্য বিচক্ষণ নবাব সর্বাগ্রে রাজধানী মুর্শিদাবাদ থেকে মুঙ্গেরে স্থানান্তরিত করেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে মীর কাশিমের যুদ্ধ হয় বক্সার নামক স্থানে, যুদ্ধে কাশিমকে পরাজিত করে ব্রিটিশ বেনিয়ারা শাসন পাকাপোক্ত করে।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতীয় উপমহাদেশে বাণিজ্য করার জন্য ষোড়শ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত একটি জয়েন্ট-স্টক কোম্পানি। এর সরকারি নাম "ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি"। ১৬০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ইংল্যান্ডের তৎকালীন রাণী প্রথম এলিজাবেথ এই কোম্পানিকে ভারতীয় উপমহাদেশে বাণিজ্য করার রাজকীয় সনদ প্রদান করেছিলেন।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
Read more